ফ্রীল্যান্সিং শুরু করতে চাইলে যা মাথায় রাখা জরুরী
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা যে কারো জন্যই একটি বিশাল
অর্জন। আর এ ক্ষেত্রে ওয়েব সেক্টর এখন অনেক ভাল ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
আমরা এখন খুব সহজেই অনলাইনের মাধ্যমে আয়ের একটি উৎস খুঁজে বেড়াই। অনেক সময়
অনেক রকমের প্রতারণার সম্মুখীনও হতে হয়। আবার যে সকল কাজগুলো সত্যিই
কার্যকর সেগুলোও অনেক সময় একটু সাহসের অভাবে করে ওঠা হয় না। তাই আজকের এই
লেখাতে পুরো ব্যাপারটিকেই একটি আকার দেয়ার চেষ্টা করব।
আমাদের
চারপাশে অনলাইনে টাকা আয়ের এত উপায়ের মধ্যে আপনারা যেন হারিয়ে না যান- সে
জন্য এই লেখা। অনেক সময়ই 'ফ্রীল্যান্সিং শিখুন- স্বনির্ভর হোন!' টাইপের
বিজ্ঞাপণ আমাদের চোখে পড়ে। আসলে অর্থ-কড়ি, টাকা-পয়সার প্রতি আমাদের টান এর
কারনেই আমরা এ সকল অফার লুফে নিতে চেষ্টা করি। কিন্তু সকল চেষ্টার আগে
আমাদের যা কিছু মাথায় রাখতে হবে, তা হল-
১। কাজের দক্ষতা
ফ্রীল্যান্সিং
হচ্ছে এক কথায় ছুটা কাজ। উন্নতবিশ্বের বাসিন্দারা তাদের যে কোন কাজ এ
সাহায্যের প্রয়োজন হলে খচরা ভাবে তা বাইরে থেকে করিয়ে নেন। এটিকে বলা হয়
আউট সোর্সিং। আর আউটসোর্স সাপোর্ট ওয়ার্কাররাই ফ্রীল্যান্সার। স্থায়ী ভাবে
নিয়োগ না পেয়েই ফ্রীল্যান্সিং করা যায়। আর বায়াররা মূলত যে সকল কাজ
আউটসোর্সিং করিয়ে নেন তার ৮০% এরও বেশি কাজ ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কিংবা তা
সম্পর্কিত। তাই ফ্রীল্যান্সিং করতে হলে আমি বলব ওয়েব ডেভেলপমেন্ট এর ওপর
ভাল দখল থাকতে হবে। আজকাল ফ্রীল্যান্সিংয়ের অনেক ফ্রী পরামর্শ পাওয়া যায়।
আর বিশদ জানতে চাইলে ফ্রীল্যান্সিং শেখার কোর্স করতে হয়। যেখানে শুধু
মার্কেটপ্লেস এবং কম্পিটিশন সম্পর্কে অনেক ধারনা দেয়া হলেও 'দক্ষতা'
বিষয়টিকে বরাবরই এড়িয়ে যাওয়া হয়। কোথাওতো শুধু মাত্র ব্ল্যাক লিংক
বিল্ডিংকেই ফ্রীল্যান্সিং/এসইও ওয়ার্ক বলে আক্ষা দেয়া হয়।
মনে
রাখবেন, ফ্রীল্যান্সিং করতে হলে আপনাকে ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক্স, সার্চ
ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন কিংবা অনলাইন মার্কেটিং এর কাজের উপর ভাল দক্ষতা থাকতেই
হবে। আপনি চাইলে এখনই শুরু করতে পারবেন, হয়ত কাজও পাবেন; কিন্তু এসবের উপর
দক্ষতা আসার পরেই তা ক্লায়েন্টকে করে দিতে পারবেন। সুতরাং ঝোপ বুঝে কোপ
মারার চিন্তা না করে আগে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলুন।
২। মার্কেটপ্লেস ও মার্কেট আইডিয়া
সবার আগে আপনাকে মার্কেটপ্লেস এ রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। জনপ্রিয় মার্কেটপ্লেসগুলোর মধ্যে Odesk, Elance, Freelancer
অন্যতম। বর্তমানে অবশ্য ওডেস্ক ও ইল্যান্স যৌথ ভাবে কাজ করা শুরু করেছে।
মার্কেটপ্লেস সম্পর্কে ভালভাবে ধারণা না থাকাটা অনেক সময়েই বুমেরাং হয়ে
দাঁড়ায়। কাজের বাজার-বাজার দর উভয় ধারণাই এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কেটপ্লেস এ রেজিস্ট্রেশনের পরে প্রথম কাজ হল সুন্দর একটি প্রোফাইল দাড়
করা। এক্ষেত্রে একটু সুন্দর করে সময় দিয়ে ধাপে ধাপে ওয়ার্কার প্রোফাইল
তৈরী করা হল বুদ্ধিমানের কাজ। আরেকটি বড় কাজ হচ্ছে আপনার পূর্ববর্তী কাজের
একটি পোর্টফোলিও তৈরী করা। এটিই আপনাকে আপনার প্রথম কাজটি পাইয়ে দিতে
অনেকখানি সাহায্য করবে। কেননা প্রথম কাজটি পাওয়াই সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। একটি
প্রোফাইল সম্পূর্ণ করতে মার্কেটপ্লেস ভেদে বিভিন্ন চাহিদা পূরণ করতে হয়।
একবার
আপনার প্রোফাইল সম্পূর্ণ হয়ে গেলে পরে আপনার কাজ হল বিড করা। কিছু
মার্কেটপ্লেসে বিডের লিমিট থাকে। তাই অবান্তর এবং শুধু শুধু বিড করা থেকে
নিজেকে বিরত রাখুন। বিড এ PM বা পার্সোনাল ম্যাসেজ করুন। সেখানে একটু
আকর্ষণীয় কিছু লেখার চেষ্টা করুন। মুখস্থ বা কমন কিছু লিখবেন না যাতে
বায়ারের কাছে আপনার বিডটি র্যান্ডম এবং অর্ডিনারি মনে হয়।
বায়ার
আউটসোর্সিং এর এড পোস্ট করার পর প্রথম ৫-৭টি বিডই তাদের মনযোগ আকর্ষণ করে।
তাই বিডার হিসেবে দ্রুত হবার চেষ্টা করুন। সেই সাথে যুতসই ও প্রযেক্ট
রিলেটেড ম্যাসেজ লিখুন। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় কাজ পেয়ে যাবেন। এতে অবশ্য
২দিনও লাগতে পারে... আবার ২ মাসও। তাই লেগে থাকুন, ধৈর্য রাখুন।
৩। কমিউনিকেশন
ফ্রীল্যান্সিং
এ যোগাযোগ হল একটি মোক্ষম পয়েন্ট। পৃথিবীর দু'প্রান্তের দু'জন মানুষ- একজন
আরেকজনকে কাজ দেবে, মুখোমুখি দেখা করা ছাড়া! যোগাযেগ এ আপনার ভাল দক্ষতা
থাকতেই হবে। ইংলিশ জানাটা এক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আপনার কিছুটা ভাষা
দূর্বলতা থাকলেও তা যেন ক্লায়েন্টের কাছে খুব বড় হয়ে দেখা না দেয়, সে
ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখুন।
ক্লায়েন্ট যদি আপনাকে কাজের জন্য একসেপ্ট করে
কিংবা ইনভাইট করে, চেষ্টা করুন দ্রুত সাড়া দিতে। প্রাইভেট ম্যাসেজিং এর
ক্ষেত্রেও এটি খেয়াল রাখবেন।
৪। টাইমিং ও ডেডলাইন
প্রজেক্ট
পাবার পরেই কিন্তু কাজ শেষ নয়। আর প্রজেক্ট পাওয়ার চেয়ে তা সম্পন্ন করে
বুঝিয়ে দেয়াটা অনেক বেশি কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। তাই সাবলিল ভাবে
ক্লায়েন্টের প্রজেক্ট রিকোয়ারমেন্ট পূরণ করতে চেষ্টা করুন। কাজের দক্ষতা ও
কিছুটা অভিজ্ঞতা থাকলে এ ব্যাপারটাও কোন সমস্যার নয়। আর হ্যা! নির্ধারিত
সময়ের মধ্যে প্রজেক্ট হ্যান্ডওভার করতে চেষ্টা করুন। ডেডলাইন অনুযায়ী শেষ
করতে না পারলে প্রজেক্টের পারিশ্রমিকতো পাবেনই না, সেই সঙ্গে মাইনাস
রেটিং/রিভিউ এরও ভয় আছে।
৫। পেমেন্ট
প্রজেক্টে এসক্রু
পেমেন্ট এর সিকিউরিটি আছে কিনা দেখে নিন। অর্থাৎ কাজের এড এর সাথে সাথে
বায়ার মার্কেটপ্লেসে এডভান্স পেমেন্ট করে রেখেছে কি না? এটা করা থাকলে কাজ
শেষে পেমেন্ট না পাওয়ার বিপদ থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন। আর সকল পেমেন্টই
ক্লায়েন্টকে মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমেই করতে বলবেন। তাতে কর্তৃপক্ষ আপনার
পেমেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখবে। কমিশন বাঁচাতে গিয়ে কখনোই
মার্কেটপ্লেসের বাইরে পেমেন্ট গ্রহণ করবেন না।
টাকা উইথড্র করতে চাইলে বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করা যায়। যেমন- Skrill, Bank Transfer, Payoneer Card.
তবে
বাংক এ টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে ফি বেশি। ভাল হয় যদি পেওনিয়র মাস্টার কার্ড
এর জন্য এপ্লাই করেন। কেন না এই কার্ডে জমাকৃত ডলার আপনি চাইলে স্থানীয়
এটিএম থেকে টাকা হিসেবে উঠাতে পারবেন।
অনেকে সবে মাত্র শুরু করছেন।
এদের জন্য ব্যাপারটা একটু জটিল হয়ে থাকতে পারে। অনেকে ধৈর্য্য রাখতে পারেন
না। তাই দেখে বুঝে আগানো ভাল। সুন্দর ভাবে চিন্তা করে বুঝে শুনে শুরু করলে
আপনার ফ্রীল্যান্সিং কারিয়ার হবে সফল ও বেগবান।

